ওভারভিউ
সার্ভিক্স বা জরায়ুমুখ হল জরায়ুর নিচের দিকে থাকা একটি অংশ, যা জরায়ু ও যোনিপথের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে। গর্ভধারণ, মাসিক চক্র এবং প্রসবের সময় সার্ভিক্সের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। হরমোনের পরিবর্তনের সঙ্গে সার্ভিক্সের অবস্থান, দৃঢ়তা এবং সার্ভিক্যাল মিউকাসের বৈশিষ্ট্যও পরিবর্তিত হতে পারে।
সার্ভিক্সের কিছু সমস্যা সরাসরি গর্ভধারণের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে, আবার কিছু সমস্যা মূলত গর্ভাবস্থার সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই সার্ভিক্সের গঠন, কাজ এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত সাধারণ সমস্যাগুলি সম্পর্কে জানা প্রজননস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
Cervix meaning in Bengali হলো জরায়ুমুখ। এটি জরায়ুর নিচের সরু অংশ, যা জরায়ুর মূল অংশের সঙ্গে যোনিপথের সংযোগ তৈরি করে। সার্ভিক্সের একটি অংশ জরায়ুর ভেতরের দিকে থাকে এবং অন্য অংশ যোনিপথের দিকে প্রসারিত হয়।
সার্ভিক্সের মাঝখানে থাকা সরু পথকে সার্ভিক্যাল ক্যানাল বলা হয়। এই পথের মাধ্যমে মাসিকের রক্ত জরায়ু থেকে যোনিপথে বের হয়। একইভাবে, প্রজননের ক্ষেত্রে সার্ভিক্যাল মিউকাসের পরিবর্তনের মাধ্যমে শুক্রাণুর জরায়ুর দিকে অগ্রসর হওয়ার পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
সার্ভিক্স শুধু একটি শারীরিক সংযোগস্থল নয়, এটি প্রজননব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যকারিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সার্ভিক্স মূলত শক্তিশালী সংযোজক টিস্যু ও মসৃণ পেশি দিয়ে তৈরি। এর গঠন এমন যে এটি জরায়ুকে যোনিপথের সঙ্গে যুক্ত রাখে এবং একই সঙ্গে বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় অবস্থায় পরিবর্তিত হতে পারে।
সার্ভিক্সের প্রধান কাজগুলির মধ্যে রয়েছে—
গর্ভাবস্থার অধিকাংশ সময় সার্ভিক্স সাধারণত বন্ধ ও দৃঢ় থাকে। প্রসবের কাছাকাছি সময়ে হরমোন ও অন্যান্য শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনের প্রভাবে এটি নরম, পাতলা এবং ধীরে ধীরে প্রসারিত হতে শুরু করে।
মাসিক চক্রের সঙ্গে সার্ভিক্সের অবস্থান ও সার্ভিক্যাল মিউকাসের পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হল ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের মতো প্রজনন হরমোনের ওঠানামা।
ডিম্বস্ফোটনের কাছাকাছি সময়ে ইস্ট্রোজেনের প্রভাবে সার্ভিক্যাল মিউকাস সাধারণত বেশি স্বচ্ছ, পিচ্ছিল এবং প্রসারণযোগ্য হয়। এই ধরনের মিউকাস শুক্রাণুর চলাচলের জন্য তুলনামূলকভাবে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
ডিম্বস্ফোটনের পরে প্রোজেস্টেরনের প্রভাবে মিউকাস সাধারণত ঘন হয়ে যায়। ফলে সার্ভিক্যাল ক্যানালের বৈশিষ্ট্যও পরিবর্তিত হয়।
তবে শুধু সার্ভিক্যাল মিউকাসের পরিবর্তন দেখে ডিম্বস্ফোটন নিশ্চিত করা যায় না। গর্ভধারণের পরিকল্পনা করলে মাসিক চক্র, ডিম্বস্ফোটনের সময় এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অন্যান্য ফার্টিলিটি মূল্যায়ন বিবেচনা করা যেতে পারে।
গর্ভধারণের পর সার্ভিক্সের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। গর্ভাবস্থার শুরু থেকে সার্ভিক্স সাধারণত বন্ধ ও দৃঢ় অবস্থায় থাকে। সার্ভিক্যাল মিউকাস ঘন হয়ে মিউকাস প্লাগ তৈরি করতে পারে, যা জরায়ুমুখকে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে।
গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়ে প্রসবের প্রস্তুতি হিসেবে সার্ভিক্স ধীরে ধীরে নরম ও পাতলা হতে শুরু করে। এরপর প্রসবের সময় এটি প্রসারিত হয়, যাতে শিশুর জন্মপথ তৈরি হয়।
তবে গর্ভাবস্থার মাঝামাঝি সময়ে সার্ভিক্স স্বাভাবিক সময়ের আগে দুর্বল হয়ে খুলতে শুরু করলে সার্ভিক্যাল ইনসাফিসিয়েন্সি বা জরায়ুমুখের অক্ষমতার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাভাবিক গর্ভধারণের ক্ষেত্রে সার্ভিক্স এবং সার্ভিক্যাল মিউকাসেরও একটি ভূমিকা রয়েছে। ডিম্বস্ফোটনের সময় সার্ভিক্যাল মিউকাসের পরিবর্তন শুক্রাণুর জরায়ুর দিকে অগ্রসর হতে সহায়তা করতে পারে।
তবে শুধু সার্ভিক্সের সমস্যা থাকলেই সবসময় বন্ধ্যাত্ব হয় না। সার্ভিক্যাল স্টেনোসিস, পূর্ববর্তী সার্ভিক্যাল অস্ত্রোপচার বা কিছু সংক্রমণ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে শুক্রাণুর স্বাভাবিক চলাচল বা প্রজননপথের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
যদি নিয়মিত চেষ্টা সত্ত্বেও গর্ভধারণ না হয়, তাহলে শুধু সার্ভিক্স নয়, ডিম্বস্ফোটন, ডিম্বাশয়ের কার্যকারিতা, ফ্যালোপিয়ান টিউব এবং পুরুষের শুক্রাণুর স্বাস্থ্যসহ উভয় সঙ্গীর ফার্টিলিটি মূল্যায়ন করা হয়।
সার্ভিক্যাল স্টেনোসিস হল সার্ভিক্যাল ক্যানাল অস্বাভাবিকভাবে সরু হয়ে যাওয়া বা আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া। এর ফলে মাসিকের রক্ত বের হতে সমস্যা হতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রজননসংক্রান্ত সমস্যাও হতে পারে। সার্ভিক্যাল অস্ত্রোপচার, কিছু চিকিৎসা-পদ্ধতি, সংক্রমণ বা বয়সজনিত পরিবর্তন এর কারণ হতে পারে।
সার্ভিক্যাল ইনসাফিসিয়েন্সি হল এমন একটি অবস্থা, যেখানে গর্ভাবস্থায় সার্ভিক্স নির্ধারিত সময়ের আগেই দুর্বল হয়ে ছোট বা প্রসারিত হতে শুরু করে, অনেক সময় প্রসববেদনা ছাড়াই। এর ফলে দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে গর্ভপাত বা প্রি-টার্ম বার্থের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
সার্ভিক্সে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা অন্যান্য জীবাণুর সংক্রমণকে সার্ভিক্যাল ইনফেকশন বলা হয়। কিছু যৌনবাহিত সংক্রমণ এর কারণ হতে পারে। অস্বাভাবিক যোনিস্রাব, সহবাসের পর রক্তপাত বা পেলভিক অস্বস্তি দেখা দিতে পারে, যদিও অনেক ক্ষেত্রে কোনো উপসর্গ থাকে না।
উচ্চ-ঝুঁকির হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস বা এইচপিভি-এর দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ সার্ভিক্সের কোষে পরিবর্তন ঘটিয়ে সার্ভিক্যাল ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
পেলভিক পরীক্ষার সময় চিকিৎসক যোনিপথ ও সার্ভিক্স পর্যবেক্ষণ করেন। অস্বাভাবিক স্রাব, রক্তপাত, প্রদাহ বা দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন থাকলে তা শনাক্ত করতে এই পরীক্ষা সাহায্য করতে পারে।
প্যাপ স্মিয়ার-এর মাধ্যমে সার্ভিক্সের কোষ সংগ্রহ করে অস্বাভাবিক কোষীয় পরিবর্তন আছে কি না পরীক্ষা করা হয়। অন্যদিকে এইচপিভি টেস্ট সার্ভিক্সে উচ্চ-ঝুঁকির এইচপিভি সংক্রমণ শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয়।
নিয়মিত সার্ভিক্যাল ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে ক্যানসারে পরিণত হওয়ার আগেই কিছু প্রি-ক্যানসারাস পরিবর্তন শনাক্ত করা সম্ভব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সার্ভিক্যাল ক্যানসার প্রতিরোধে উচ্চমানের স্ক্রিনিং ও শনাক্ত হওয়া প্রি-ক্যানসারাস পরিবর্তনের চিকিৎসার ওপর গুরুত্ব দেয়।
প্রয়োজন অনুযায়ী ট্রান্সভ্যাজাইনাল আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে জরায়ু, জরায়ুমুখ, ডিম্বাশয় এবং অন্যান্য পেলভিক অঙ্গের অবস্থা দেখা যেতে পারে। গর্ভাবস্থায় সার্ভিক্সের দৈর্ঘ্য পর্যবেক্ষণের জন্যও আল্ট্রাসাউন্ড ব্যবহার করা হতে পারে।
সার্ভিক্স ও গর্ভধারণ নিয়ে বেশ কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা রয়েছে। সেগুলোর কয়েকটি হলো:
সার্ভিক্সের সমস্যা থাকলেই গর্ভধারণ অসম্ভব হয় না। প্রভাব নির্ভর করে সমস্যার ধরন ও তীব্রতার উপর।
প্রসবের প্রস্তুতি হিসেবে গর্ভাবস্থার শেষ দিকে সার্ভিক্স নরম ও পাতলা হওয়া এবং ধীরে ধীরে খুলতে থাকা স্বাভাবিক।
কিছু সার্ভিক্যাল সমস্যা বা সংক্রমণে কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে।
সব সংক্রমণ ক্যানসার সৃষ্টি করে না। তবে দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ-ঝুঁকির এইচপিভি সংক্রমণ সার্ভিক্যাল ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
নির্ধারিত সময়ের আগে সার্ভিক্স ছোট বা খুলতে শুরু করলে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে।
নিচের লক্ষণ বা পরিস্থিতি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত:
ফার্টিলিটি নিয়ে সমস্যা থাকলে শুধু সার্ভিক্সকে কারণ হিসেবে না ধরে উভয় সঙ্গীর পূর্ণাঙ্গ ফার্টিলিটি মূল্যায়ন করা উচিত।