ওভারভিউ
Menopause meaning in Bengali হলো মাসিক বা ঋতুস্রাব স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় পর্যায়। সাধারণত ৪৫ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে মেনোপজ হয়। তবে প্রত্যেকের ক্ষেত্রে বয়স এবং অভিজ্ঞতা একরকম নয়।
মেনোপজের আগে কয়েক বছর ধরে মাসিক অনিয়মিত হওয়া, হঠাৎ গরম লাগা, রাতে ঘাম, ঘুমের সমস্যা বা মুড পরিবর্তনের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এই সময়কে বলা হয় পেরিমেনোপজ। শেষ মাসিকের পর টানা ১২ মাস মাসিক না হলে সাধারণত মেনোপজ হয়েছে বলে ধরা হয়, যদি অন্য কোনও কারণ না থাকে।
সহজভাবে বললে, মেনোপজ হল সেই সময়, যখন ডিম্বাশয়ের কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে গিয়ে ডিম্বাণু নিঃসরণ এবং মাসিক বন্ধ হয়ে যায়। এর সঙ্গে শরীরে ওয়েস্ট্রোজেন-এর মতো হরমোনের মাত্রাও কমে আসে।
মেনোপজ কোনও রোগ নয়। এটি নারীর জীবনের একটি স্বাভাবিক বায়োলজিক্যাল পরিবর্তন। তবে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে কারও ক্ষেত্রে লক্ষণ খুব সামান্য হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে তা দৈনন্দিন জীবন, ঘুম, কাজ বা মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিম্বাশয়ে থাকা ডিম্বাণুর ভাণ্ডার ধীরে ধীরে কমতে থাকে। এর ফলে ডিম্বাণু বের হওয়া বা ওভুলেশন অনিয়মিত হতে পারে এবং ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রাও কমতে শুরু করে।
প্রথম দিকে মাসিকের তারিখে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। কখনও তাড়াতাড়ি, আবার কখনও দেরিতে মাসিক হতে পারে। রক্তপাতের পরিমাণও কম-বেশি হতে পারে। ধীরে ধীরে মাসিক পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
পেরিমেনোপজ হলো মেনোপজের আগের পরিবর্তনের সময়। এই পর্যায়ে ডিম্বাশয় থেকে হরমোন তৈরি এবং ওভুলেশন ধীরে ধীরে অনিয়মিত হতে থাকে।
এই সময়কাল সবার ক্ষেত্রে একরকম নয় এবং কয়েক বছর পর্যন্ত চলতে পারে। মাসিকের পরিবর্তনের পাশাপাশি শরীরে তীব্র গরমভাব অনুভব, রাতে অতিরিক্ত ঘাম, ঘুমের সমস্যা, মেজাজের পরিবর্তন বা যোনিপথে শুষ্কতা দেখা দিতে পারে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পেরিমেনোপজ চলাকালীন গর্ভধারণ সম্ভব, কারণ এই সময়ে কিছু ক্ষেত্রে ওভুলেশন হতে পারে। তাই গর্ভধারণ এড়াতে চাইলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গর্ভনিরোধক ব্যবহার করা প্রয়োজন।
মেনোপজের পরের সময়কে পোস্টমেনোপজ বলা হয়। এই সময়ে সাধারণত আর মাসিক হয় না এবং ডিম্বাশয় থেকে হরমোন তৈরি অনেকটাই কমে যায়।
তবে মেনোপজের কিছু লক্ষণ, যেমন যোনিপথে শুষ্কতা, ঘুমের সমস্যা বা গরম ভাব অনুভব হওয়া, মাসিক বন্ধ হওয়ার পরও কিছু সময় থাকতে পারে। ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
মেনোপজের লক্ষণ সবার একরকম হয় না। কারও খুব কম লক্ষণ থাকতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে এগুলি বেশ বিরক্তিকর হতে পারে।
সাধারণ লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে:
স্বাভাবিক মেনোপজ মূলত বয়স বাড়ার সঙ্গে ডিম্বাশয়ের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে হয়। এর ফলে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমতে থাকে এবং ডিম্বস্ফোটন ধীরে ধীরে অনিয়মিত হয়ে একসময় বন্ধ হয়ে যায়।
ইস্ট্রোজেন কমে যাওয়ার ফলে হট ফ্লাশ, যোনিপথে শুষ্কতা, ঘুমের সমস্যা ইত্যাদি দেখা দিতে পারে।
বয়সের সঙ্গে ডিম্বাশয়ে থাকা ডিম্বাণুর সংখ্যা ও কার্যক্ষমতা কমে যায়। ফলে ডিম্বস্ফোটন অনিয়মিত হয়ে শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়।
দুই ডিম্বাশয় অপসারণ করলে হরমোন দ্রুত কমে গিয়ে হঠাৎ মেনোপজের লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
কিছু ক্যানসার চিকিৎসা ডিম্বাশয়ের কার্যক্ষমতা কমিয়ে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে মেনোপজ ঘটাতে পারে।
মেনোপজ ও ফার্টিলিটির মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। গর্ভধারণের জন্য ওভুলেশন এবং কার্যকর ডিম্বাণু প্রয়োজন।
পেরিমেনোপজের সময় ফার্টিলিটি কমে গেলেও গর্ভধারণ সম্ভব, কারণ এই পর্যায়ে মাঝে মাঝে ওভুলেশন হতে পারে। তাই মেনোপজ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত গর্ভধারণ এড়াতে চাইলে গর্ভনিরোধক ব্যবহার করা প্রয়োজন।
মেনোপজ হয়ে গেলে স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণের সম্ভাবনা থাকে না, কারণ ডিম্বাশয় থেকে নিয়মিত ডিম্বাণু বের হওয়া বন্ধ হয়ে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে ডোনার এগ বা আগে সংরক্ষিত এমব্রিওর সাহায্যে ফার্টিলিটি চিকিৎসার মাধ্যমে মেনোপজের পরও গর্ভধারণ সম্ভব হতে পারে।
তাই শুধু মাসিক অনিয়মিত হলেই মেনোপজ হয়েছে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। অনিয়মিত মাসিক সম্পর্কে জানতে হলে ক্লিক করুন।
মেনোপজের সময় ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় হাড়ের ঘনত্ব ধীরে ধীরে কমতে পারে। ফলে পরবর্তী জীবনে অস্টিওপোরোসিস ও হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ইস্ট্রোজেন কমে যাওয়ার কারণে যোনিপথের টিস্যু পাতলা ও শুষ্ক হয়ে যেতে পারে। এর ফলে যোনিপথে শুষ্কতা, জ্বালা বা সহবাসের সময় অস্বস্তি হতে পারে।
মেনোপজের পর যোনি ও মূত্রনালির আশপাশের টিস্যুতে পরিবর্তনের কারণে বারবার প্রস্রাবের বেগ, প্রস্রাবের সময় অস্বস্তি বা মূত্রনালির সংক্রমণের প্রবণতা বাড়তে পারে।
মেনোপজের পর হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্যের ঝুঁকির কিছু কারণ বাড়তে পারে। তাই সুষম খাবার, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
বয়স, শারীরিক অবস্থা ও ঝুঁকির উপর ভিত্তি করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল ও হাড়ের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে।
মেনোপজের সব লক্ষণের জন্য একই ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন হয় না। লক্ষণের তীব্রতা, বয়স, চিকিৎসার ইতিহাস এবং অন্যান্য ঝুঁকির বিষয় বিবেচনা করে চিকিৎসক উপযুক্ত চিকিৎসা বেছে নিতে পারেন।
কিছু ক্ষেত্রে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনলেই উপকার পাওয়া যেতে পারে। যেমন:
হট ফ্লাশ, যোনিপথের শুষ্কতা, ঘুমের সমস্যা বা মেজাজের পরিবর্তনের মতো লক্ষণ বেশি হলে চিকিৎসক হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (HRT) বা হরমোন ছাড়া অন্য চিকিৎসার কথা বলতে পারেন। HRT সবার জন্য উপযুক্ত নয়, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া হরমোনের ওষুধ শুরু করা উচিত নয়।
মেনোপজকে শুধু মাসিক বন্ধ হওয়ার বিষয় হিসেবে না দেখে সামগ্রিক স্বাস্থ্যের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, সুষম খাবার খাওয়া এবং হাড়ের স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল বা অন্য কোনও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সেগুলি নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত।
মেনোপজের পরেও যৌনবাহিত সংক্রমণ (এসটিআই) হতে পারে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপদ যৌন সম্পর্কের পদ্ধতি মেনে চলা এবং সংক্রমণের ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
না। মেনোপজ শরীরের একটি স্বাভাবিক পরিবর্তনের ধাপ। তবে এই সময় হট ফ্লাশ, ঘুমের সমস্যা বা অন্য কোনও উপসর্গ বেশি হলে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
সব সময় নয়। পেরিমেনোপজের সময় মাসিক অনিয়মিত হতে পারে। তবে অন্য কিছু কারণেও মাসিকের সময় বা রক্তপাতের ধরনে পরিবর্তন হতে পারে।
উপসর্গ যদি দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় সমস্যা তৈরি করে, তাহলে চিকিৎসার বিভিন্ন উপায় রয়েছে। পাশাপাশি হাড় এবং হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্যের দিকেও নজর রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
না। টানা ১২ মাস মাসিক না হওয়ার পর যোনিপথে যেকোনও রক্তপাত বা স্পটিং হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
মেনোপজের লক্ষণ যদি ঘুম, কাজ, দৈনন্দিন জীবন বা সম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলে, তাহলে গাইনোকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া ভালো। বিশেষ করে অতিরিক্ত বা অস্বাভাবিক রক্তপাত হলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত।
টানা ১২ মাস বা তার বেশি সময় মাসিক না হওয়ার পর আবার যোনিপথে রক্তপাত হলে সেটিকে মেনোপজের স্বাভাবিক লক্ষণ ধরে নেওয়া উচিত নয়। সামান্য স্পটিং হলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।