ওভারভিউ
টেস্টোস্টেরনকে সাধারণত পুরুষদের প্রধান যৌন হরমোন হিসেবে বলা হয়। তবে এর কাজ শুধু যৌনক্ষমতা বা পুরুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্য তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হাড় ও পেশির স্বাস্থ্য, যৌন ইচ্ছা, লোহিত রক্তকণিকা তৈরি এবং পুরুষের প্রজনন স্বাস্থ্যের সঙ্গেও এই হরমোনের সম্পর্ক রয়েছে।
শরীরে টেস্টোস্টেরোন কম বা বেশি হওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। শুধু কয়েকটি উপসর্গ দেখে টেস্টোস্টেরোন কম বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে রক্ত পরীক্ষা করে কারণ খুঁজে বের করা হয়।
বিশেষ করে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে টেস্টোস্টেরোন নিয়ে আরও সতর্ক হওয়া দরকার। কারণ বাইরে থেকে টেস্টোস্টেরোন গ্রহণ করলে শরীরের স্বাভাবিক স্পার্ম প্রোডাকশন কমে যেতে পারে।
Testosterone meaning in Bengali হলো যৌন হরমোন, যা মূলত পুরুষদের অণ্ডকোষে তৈরি হয়। অল্প পরিমাণে এটি নারীদের শরীরেও তৈরি হয়।
পুরুষদের ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধির (puberty) সময় টেস্টোস্টেরোন-এর মাত্রা বাড়তে শুরু করে। এর ফলে কণ্ঠস্বর ভারী হওয়া, মুখ ও শরীরে লোম বৃদ্ধি, পেশির বিকাশ এবং পুরুষ প্রজনন অঙ্গের পরিপক্বতার মতো পরিবর্তন ঘটে।
প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায়ও টেস্টোস্টেরোন শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে ভূমিকা রাখে। তবে টেস্টোস্টেরোন-এর মাত্রা ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে এবং দিনের সময় অনুযায়ীও এর মাত্রা পরিবর্তিত হয়।
শরীরে টেস্টোস্টেরোন-এর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যেমন:
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুধু রক্তে টেস্টোস্টেরোন-এর মাত্রা স্বাভাবিক থাকলেই ফার্টিলিটি বা সন্তান ধারণের ক্ষমতা স্বাভাবিক থাকবে, এমন নয়। স্পার্ম প্রোডাকশন-এর জন্য শরীরের একাধিক হরমোন এবং অণ্ডকোষের স্বাভাবিক কার্যকারিতা দরকার।
টেস্টোস্টেরন ও পুরুষের প্রজননক্ষমতার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। শুক্রাণু তৈরির জন্য অণ্ডকোষে স্বাভাবিক মাত্রায় টেস্টোস্টেরন থাকা প্রয়োজনীয়।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। বাইরে থেকে টেস্টোস্টেরন ইঞ্জেকশন, জেল বা অন্য কোনও হরমোনের চিকিৎসা নিলে রক্তে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা বাড়তে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে শুক্রাণু তৈরির প্রক্রিয়া কমে যেতে পারে।
এর কারণ, বাইরে থেকে টেস্টোস্টেরন পাওয়ার পর মস্তিষ্ক ও পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে এলএইচ এবং এফএসএইচ-এর মতো হরমোনের সংকেত কমে যেতে পারে। এর ফলে অণ্ডকোষে স্বাভাবিকভাবে টেস্টোস্টেরন তৈরি এবং শুক্রাণু উৎপাদনের প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে শুক্রাণুর সংখ্যা এতটাই কমে যেতে পারে যে বীর্যে কোনও শুক্রাণু পাওয়া যায় না। এই অবস্থাকে অ্যাজুস্পার্মিয়া বলা হয়।
তাই সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে নিজের ইচ্ছায় টেস্টোস্টেরন গ্রহণ বা হরমোনের চিকিৎসা শুরু করা উচিত নয়। পুরুষের প্রজননক্ষমতা নিয়ে সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বীর্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজনে হরমোনের পরীক্ষা করা যেতে পারে। পুরুষের বন্ধ্যাত্ব সম্পর্কে আরও জানতে ইন্দিরা আইভিএফ-এর এই গাইডটি পড়তে পারেন।
টেস্টোস্টেরন কমে গেলে সবার একই ধরনের লক্ষণ দেখা যায় না। সম্ভাব্য কিছু লক্ষণ হলো:
তবে এই লক্ষণগুলোর অনেকগুলিই অন্য শারীরিক সমস্যা, মানসিক চাপ, ঘুমের সমস্যা বা কিছু ওষুধের কারণেও হতে পারে। তাই শুধু লক্ষণ দেখে টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি নির্ণয় করা যায় না। সাধারণত উপসর্গের পাশাপাশি রক্ত পরীক্ষায় ধারাবাহিকভাবে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কম পাওয়া গেলে তবেই চিকিৎসক এই সমস্যা সম্পর্কে নিশ্চিত হন।
টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। যেমন:
বয়স বাড়ার সঙ্গে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা ধীরে ধীরে কমতে পারে। তবে শুধু বয়সের কারণেই টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি হয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কারণ নির্ণয়ের জন্য উপসর্গ, শারীরিক অবস্থা এবং প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষার ফল চিকিৎসক একসঙ্গে বিবেচনা করেন।
শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি হলে কিছু শারীরিক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। তবে লক্ষণ সবার ক্ষেত্রে এক রকম নাও হতে পারে। যেমন—
বিশেষ করে বাইরে থেকে অতিরিক্ত টেস্টোস্টেরন বা অ্যানাবলিক স্টেরয়েড গ্রহণ করলে শরীরের স্বাভাবিক হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। পুরুষদের ক্ষেত্রে এর ফলে অণ্ডকোষে স্বাভাবিক টেস্টোস্টেরন ও শুক্রাণু তৈরির প্রক্রিয়া কমে যেতে পারে। তাই রক্তে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা বেশি পাওয়া গেলে কারণ খুঁজে বের করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
টেস্টোস্টেরনের মাত্রা সাধারণত রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে মাপা হয়। দিনের বিভিন্ন সময়ে এই হরমোনের মাত্রা বদলাতে পারে বলে সাধারণত সকালে পরীক্ষা করা হয়।
একবার পরীক্ষায় টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কম এলেই ঘাটতি নিশ্চিত করা যায় না। উপসর্গের সঙ্গে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা ধারাবাহিকভাবে কম থাকলে চিকিৎসক প্রয়োজনে সকালে খালি পেটে আবার পরীক্ষা করে ফল নিশ্চিত করতে পারেন।
টেস্টোস্টেরন কম হওয়ার কারণ বোঝার জন্য প্রয়োজনে এলএইচ, এফএসএইচ, প্রোল্যাক্টিন বা অন্যান্য পরীক্ষা করা হতে পারে।
সন্তান ধারণে সমস্যা থাকলে শুধু টেস্টোস্টেরন পরীক্ষা করাই যথেষ্ট নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বীর্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য প্রজনন-সংক্রান্ত পরীক্ষাও করা হতে পারে।
টেস্টোস্টেরনের মাত্রা ভালো রাখতে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সামগ্রিকভাবে সুস্থ জীবনযাপন করা। এর জন্য:
টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে ইনজেকশন, জেল বা অন্যভাবে পূরণ করা হতে পারে। তবে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে বাইরে থেকে টেস্টোস্টেরন নেওয়া সাধারণত উপযুক্ত নয়, কারণ এতে শুক্রাণু তৈরি কমে যেতে পারে।
টেস্টোস্টেরনের ঘাটতির সঙ্গে গর্ভধারণে সমস্যা থাকলে কারণ অনুযায়ী চিকিৎসক এইচসিজি, নির্বাচিত কিছু হরমোন-নিয়ন্ত্রণকারী ওষুধ বা অন্য চিকিৎসা বিবেচনা করতে পারেন। কোন চিকিৎসা উপযুক্ত হবে, তা হরমোনের মাত্রা, উপসর্গ ও ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়। তাই নিজের থেকে টেস্টোস্টেরন বা কোনও হরমোনের ওষুধ শুরু করা উচিত নয়।
শরীরে টেস্টোস্টেরনসহ বিভিন্ন হরমোনের একটি স্বাভাবিক ভারসাম্য থাকা জরুরি। টেস্টোস্টেরনের মাত্রা বেশি হলেই যে শরীর বা যৌনস্বাস্থ্য ভালো থাকবে, এমন নয়।
বাইরে থেকে টেস্টোস্টেরন গ্রহণ করলে বরং অণ্ডকোষে স্বাভাবিকভাবে শুক্রাণু তৈরির প্রক্রিয়া কমে যেতে পারে। তাই সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে নিজের ইচ্ছায় টেস্টোস্টেরন গ্রহণ করা উচিত নয়।
যৌন ইচ্ছা কমে যাওয়ার আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা, সম্পর্কের সমস্যা, কিছু ওষুধ এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যাও এর কারণ হতে পারে।
টেস্টোস্টেরনের মাত্রা দিনের বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই শুধু একটি পরীক্ষার ফল নয়, উপসর্গ এবং প্রয়োজনে একাধিক পরীক্ষার ফল বিবেচনা করেই চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।
যদি দীর্ঘদিন ধরে যৌন ইচ্ছা কমে যায়, ইরেক্শনের সমস্যা হয়, অস্বাভাবিক ক্লান্তি থাকে বা সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করেও গর্ভধারণ না হয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
বিশেষ করে গর্ভধারণে সমস্যা হলে শুধু পুরুষ বা শুধু নারীকে দায়ী না করে প্রয়োজনে দুজনেরই পরীক্ষা করা উচিত। পুরুষের প্রজননক্ষমতা কমে যাওয়ার পেছনে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, কম শুক্রাণু তৈরি হওয়া, শুক্রাণুর চলনক্ষমতার সমস্যা বা প্রজনন অঙ্গের অন্যান্য সমস্যাও থাকতে পারে।
টেস্টোস্টেরনের ঘাটতির পাশাপাশি গর্ভধারণে সমস্যা থাকলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করে সমস্যার কারণ চিহ্নিত করা এবং সেই অনুযায়ী চিকিৎসার পরিকল্পনা করা হয়।