Overview
থাইরয়েড হলো গলার সামনের দিকে থাকা একটি ছোট, প্রজাপতির মতো দেখতে গ্রন্থি, যা শরীরের মেটাবলিসম, শক্তি ব্যবহার, হৃদস্পন্দনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। থাইরয়েড থেকে পর্যাপ্ত হরমোন তৈরি না হলে হাইপোথ্যারয়ডিজম (Hypothyroidism), আর অতিরিক্ত হরমোন তৈরি হলে হাইপারথ্যারয়ডিজম (Hyperthyroidism) হতে পারে।
থাইরয়েডের লক্ষণ ব্যক্তি ও সমস্যার ধরন অনুযায়ী আলাদা হতে পারে। অতিরিক্ত ক্লান্তি, ওজনের পরিবর্তন, ঠান্ডা বা গরম সহ্য করতে না পারা, চুল পড়া বা মাসিকের পরিবর্তনের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে শুধু লক্ষণ দেখে থাইরয়েডের সমস্যা নিশ্চিত করা যায় না। প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা করে কারণ ও হরমোনের মাত্রা বোঝা হয়।
Thyroid symptoms in Bengali হল একটি এন্ড্রোক্ৰিনে গ্লাড, যা মূলত T4 (থাইরক্সিন) এবং T3 (ট্রাইআয়োডোথাইরোনিন) হরমোন তৈরি করে। এই হরমোনগুলি শরীরের কোষগুলি কত দ্রুত শক্তি ব্যবহার করবে, তা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই থাইরয়েডের প্রভাব শুধু একটি অঙ্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, হৃদপিণ্ড, হজমতন্ত্র, পেশি এবং শরীরের অন্যান্য ব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়ে।
মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে TSH নামে একটি হরমোন বের হয়, যা থাইরয়েডকে হরমোন তৈরির সংকেত দেয়। এই ব্যবস্থায় ভারসাম্য নষ্ট হলে থাইরয়েড কম বা বেশি কাজ করতে পারে।
থাইরয়েডের লক্ষণ নির্ভর করে হরমোনের মাত্রা কমেছে নাকি বেড়েছে তার উপর। সাধারণভাবে দেখা যেতে পারে:
তবে এই উপসর্গগুলির অনেকগুলিই অন্য কারণেও হতে পারে। তাই শুধু ক্লান্তি বা ওজন পরিবর্তন হলেই থাইরয়েড হয়েছে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
থাইরয়েড কম কাজ করলে শরীরে প্রয়োজনের তুলনায় কম থাইরয়েড হরমোন তৈরি হয়। এই অবস্থার লক্ষণ অনেক সময় ধীরে ধীরে দেখা দেয়।
সাধারণ লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে:
সব রোগীর ক্ষেত্রে একই লক্ষণ দেখা যায় না। আবার অনেকের ক্ষেত্রে শুরুতে উপসর্গ খুব সামান্যও হতে পারে। এই হাইপোথ্যারয়ডিজম-এর ব্যাপারে স্ববিস্তরে জানুন।
থাইরয়েড শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি হরমোন তৈরি করে। ফলে শরীরের মেটাবলিসম বেড়ে যেতে পারে।
এর সাধারণ লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে:
উপসর্গ বেশি হলে বা দীর্ঘদিন চিকিৎসা না হলে হাইপারথ্যারয়ডিজম হৃদ্যন্ত্র, হাড় এবং রিপ্রোডাক্টিভ হেলথ-এর উপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
মহিলাদের ক্ষেত্রে থাইরয়েডের সমস্যা অনেক সময় মাসিক এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের পরিবর্তনের মাধ্যমে বোঝা যায়।
থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলে মাসিক অনিয়মিত হতে পারে, মাসিকের সময় রক্তপাতের পরিমাণ বদলে যেতে পারে বা ডিম্বস্ফোটনে সমস্যা হতে পারে। এর সঙ্গে ওজনের পরিবর্তন, অতিরিক্ত ক্লান্তি, চুল পড়া এবং মেজাজের পরিবর্তনও দেখা দিতে পারে।
তবে এই লক্ষণগুলি শুধু থাইরয়েডের সমস্যার জন্য হয় না। পিসিওএস, রক্তস্বল্পতা, মানসিক চাপ বা অন্য হরমোনজনিত সমস্যার কারণেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
তাই শুধু লক্ষণ দেখে কারণ ধরে নেওয়ার পরিবর্তে প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ।
থাইরয়েডের সমস্যা বিভিন্ন কারণে হতে পারে। এর মধ্যে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সমস্যা, আয়োডিনের ঘাটতি, হরমোনের পরিবর্তন এবং থাইরয়েড গ্রন্থিতে অস্বাভাবিক পরিবর্তন অন্যতম।
হাইপোথাইরয়েডিজমের একটি সাধারণ কারণ হলো হাশিমোটো থাইরয়েডাইটিস ((Hashimoto’s disease)। এটি একটি স্বয়ংক্রিয় প্রতিরোধজনিত রোগ, যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে থাইরয়েড গ্রন্থিকে আক্রমণ করে। আবার শরীরে আয়োডিনের ঘাটতি থাকলেও থাইরয়েড হরমোন তৈরিতে সমস্যা হতে পারে।
অন্যদিকে, গ্রেভস রোগের মতো স্বয়ংক্রিয় প্রতিরোধজনিত সমস্যায় থাইরয়েড অতিরিক্ত হরমোন তৈরি করতে পারে। এছাড়া থাইরয়েডে নোডিউল, প্রদাহ, কিছু ওষুধ, আগের রেডিয়েশন চিকিৎসা বা থাইরয়েডের অস্ত্রোপচারের কারণেও সমস্যা হতে পারে। গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তন এবং থাইরয়েড হরমোনের চাহিদা বাড়ার কারণেও থাইরয়েডের কার্যকারিতায় পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
থাইরয়েডের সমস্যা নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক প্রথমে রোগীর লক্ষণ ও শারীরিক অবস্থা দেখেন। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী কয়েকটি পরীক্ষা করা হতে পারে।
থাইরয়েডের চিকিৎসা নির্ভর করে সমস্যা হাইপোথাইরয়েডিজম নাকি হাইপারথাইরয়েডিজম, তার কারণ এবং হরমোনের মাত্রার উপর।
সাধারণত লেভোথাইরক্সিন দেওয়া হয়, যা শরীরে থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি পূরণে সাহায্য করে। রক্ত পরীক্ষার ফল অনুযায়ী চিকিৎসক ওষুধের মাত্রা নির্ধারণ করেন। নিজের ইচ্ছায় ওষুধ বন্ধ বা মাত্রা পরিবর্তন করা উচিত নয়।
কারণ ও তীব্রতা অনুযায়ী অ্যান্টিথাইরয়েড ওষুধ, তেজস্ক্রিয় আয়োডিন বা কিছু ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার করা হতে পারে।
চিকিৎসা চলাকালীন নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা জরুরি। এতে হরমোনের মাত্রা এবং ওষুধের কার্যকারিতা বোঝা যায়। উপসর্গের কোনো পরিবর্তন হলে চিকিৎসককে জানানো উচিত।
থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে প্রথমে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি সুষম খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে।
তবে শুধু খাবার বা জীবনযাপনের পরিবর্তনের মাধ্যমে সব ধরনের থাইরয়েডের সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া আয়োডিন বা অন্য কোনো খাদ্য-পরিপূরক খাওয়া উচিত নয়।
থাইরয়েড হরমোন নারী ও পুরুষ উভয়ের প্রজনন স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষ করে থাইরয়েডের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে মহিলাদের মাসিকের স্বাভাবিক প্যাটার্ন ও ডিম্বস্ফোটনে প্রভাব পড়তে পারে। এর ফলে কিছু ক্ষেত্রে গর্ভধারণে সমস্যা হতে পারে।
পুরুষদের ক্ষেত্রেও থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্যহীনতা শুক্রাণুর সংখ্যা, চলনশক্তি বা গুণমানের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে থাইরয়েডের সমস্যা থাকলেই গর্ভধারণ সম্ভব নয়, এমনটা নয়। সঠিক রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই থাইরয়েডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
নিচের লক্ষণগুলির কোনোটি দীর্ঘদিন ধরে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো: