Overview
জরায়ু মহিলাদের শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যা গর্ভধারণ ও সন্তান ধারণে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এই লেখায় জরায়ু কী, কোথায় থাকে, এর গঠন ও কাজ কী, এবং গর্ভধারণের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী, তা সহজভাবে বলা হয়েছে। পাশাপাশি জরায়ুর সাধারণ সমস্যা, পরীক্ষা এবং কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার, সেগুলিও তুলে ধরা হয়েছে।
Uterus meaning in Bengali হল জরায়ু। যাকে অনেকে সহজ ভাষায় গর্ভাশয় বা womb-ও বলে। এটি নারীর প্রজনন তন্ত্রের একটি ফাঁপা, পেশিবহুল অঙ্গ, দেখতে অনেকটা উল্টানো নাশপাতির মতো। এটি তলপেটে, মূত্রথলি আর মলদ্বারের মাঝখানে থাকে।
জরায়ুর গঠন বুঝতে গেলে প্রথমে এর আকৃতিটা কল্পনা করা সহজ। সামনে থেকে দেখলে জরায়ু অনেকটা উল্টো করে রাখা নাশপাতির মতো দেখতে। আবার পাশ থেকে দেখলে এর আকৃতি কিছুটা বাঁকানো বা শিমের মতো মনে হতে পারে। এই অঙ্গটি শরীরের পেলভিস-এর মধ্যে থাকে এবং bladder-এর পিছনে ও রেকটাম-এর সামনে অবস্থান করে।
প্রেগন্যান্সি না থাকলে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মহিলার জরায়ু সাধারণত ছোট আকারের হয়, প্রায় একটা মুঠোর সমান। এর গড় দৈর্ঘ্য প্রায় ৩ ইঞ্চি এবং প্রস্থ প্রায় ২ ইঞ্চি হতে পারে। তবে বয়স, প্রেগন্যান্সি রেকর্ড এবং অন্যান্য শারীরিক কারণে জরায়ুর আকারে কিছুটা পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক।
জরায়ুকে শুধু একটি অঙ্গ হিসেবে না দেখে এর বিভিন্ন অংশ আলাদা করে বুঝলে জরায়ুর গঠন আরও পরিষ্কার হয়।
জরায়ু প্রজনন স্বাস্থ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মাসিক চক্র থেকে শুরু করে নিষিক্ত ডিম্বাণুর স্থাপন, গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের বেড়ে ওঠা এবং সন্তান প্রসব, প্রতিটি পর্যায়েই জরায়ুর আলাদা ভূমিকা রয়েছে।
প্রতি মাসে হরমোনের প্রভাবে জরায়ুর ভেতরের আস্তরণ ধীরে ধীরে পুরু হয়। এর উদ্দেশ্য হল, গর্ভধারণ হলে নিষিক্ত ডিম্বাণু যাতে সেখানে স্থাপন হতে পারে, তার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা।
যদি সেই মাসে গর্ভধারণ না হয়, তাহলে জরায়ুর ভেতরের এই আস্তরণের একটি অংশ শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। এটিই মাসিক হিসেবে দেখা যায়। এই সময় জরায়ুর পেশি সংকুচিত হওয়ার কারণে অনেকের তলপেটে ব্যথা বা খিঁচ ধরার মতো অনুভূতি হতে পারে।
গর্ভধারণের প্রক্রিয়ায় ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলন সাধারণত ডিম্বনালিতে ঘটে এবং এই মিলনে ফলে যদি ডিম্বাণু সফল ভাবে নিষিক্ত হয় তাহলে সৃষ্ট ভ্রূণটি জরায়ুতে চলে আসে।
জরায়ুর ভেতরে আস্তরণে ভ্রূণ ঠিকভাবে স্থাপন হলে গর্ভধারণের পরের ধাপ শুরু হয়। এটি প্রেগন্যান্সির প্রথম পর্যায় যেতে জরায়ু একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা প্রদান করে।
জরায়ু ও গর্ভধারণের মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। জরায়ুর ভেতরে আস্তরণে ভ্রুনকে সঠিক ভাবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে, এবং সেই অনুযায়ী প্রসারিতও হতে থাকে।
এই ক্ষেত্রে প্লাসেন্টা দ্বারা গর্ভস্থ শিশুর কাছে অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি পৌঁছায় এবং গর্ভাবস্থায় শিশুর বিকাশে সাহায্য হয়।
গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়ে সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় জরায়ুর পেশিতে নিয়মিত সংকোচন শুরু হয়। এই সংকোচনের ফলে জরায়ুমুখ ধীরে ধীরে খুলতে থাকে। পরে সেই সংকোচন শিশুকে জন্মনালির দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।
অর্থাৎ, জরায়ুর প্রধান কাজ শুধু গর্ভস্থ শিশুকে ধারণ করা নয়। মাসিক চক্র, ভ্রূণের স্থাপন, গর্ভাবস্থায় শিশুর বেড়ে ওঠা এবং সন্তান প্রসব, সবকিছুর সঙ্গেই জরায়ুর গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।
গর্ভধারণের ক্ষেত্রে জরায়ুর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নিষিক্ত ডিম্বাণু থেকে তৈরি ভ্রূণ জরায়ুর ভেতরের আস্তরণে এসে বসে, যাকে এন্ডোমেট্রিয়াম বলা হয়। তাই জরায়ুর গঠন বা ভেতরের অবস্থায় কোনও সমস্যা থাকলে কিছু ক্ষেত্রে গর্ভধারণে বা গর্ভধারণ টিকিয়ে রাখতে প্রভাব পড়তে পারে।
এই কারণেই বন্ধ্যাত্বের কারণ খোঁজার সময় শুধু ডিম্বাশয় বা শুক্রাণুর দিকটি দেখা হয় না, জরায়ুর অবস্থাও পরীক্ষা করা হয়। মহিলাদের বন্ধ্যাত্বের কারণ ও পরীক্ষা সম্পর্কে ইন্দিরা IVF-এর এই বিস্তারিত গাইডটি দেখতে পারেন।
ফাইব্রয়েড হল জরায়ুর পেশির স্তরে তৈরি হওয়া এক ধরনের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। এগুলি সাধারণত ক্যানসার নয় এবং আকারেও ছোট-বড় হতে পারে। কারও জরায়ুতে একটি ফাইব্রয়েড থাকতে পারে, আবার কারোর একাধিকও হতে পারে।
অনেকের ক্ষেত্রে ফাইব্রয়েড থাকলেও কোনও সমস্যা হয় না। আবার কারও মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত, বেশি ব্যথা, তলপেটে চাপ বা ভারী লাগার মতো সমস্যা হতে পারে।
জরায়ুর ভেতরের আস্তরণের মতো টিস্যু যদি জরায়ুর বাইরে বেড়ে ওঠে তাহলে সেটাকে এন্ডোমেট্রিওসি। এটি ডিম্বাশয়, ডিম্বনালি বা পেলভিসের অন্য অংশেও থাকতে পারে।
এর ফলে মাসিকের সময় খুব বেশি ব্যথা, তলপেটে দীর্ঘদিন ব্যথা বা সহবাসের সময় ব্যথা হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে গর্ভধারণেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।
অ্যাডেনোমায়োসিস হলে জরায়ুর ভেতরের আস্তরণের মতো টিস্যু জরায়ুর পেশির স্তরের মধ্যে ঢুকে বাড়তে শুরু করে। এর ফলে জরায়ু কিছুটা বড় হতে পারে এবং মাসিকের সময় বেশি রক্তপাত বা বেশি ব্যথা হতে পারে।
কিছু মানুষের তলপেটে দীর্ঘদিন ব্যথা থাকতে পারে, আবার কারও কোনও লক্ষণই নাও থাকতে পারে। তাই শুধু উপসর্গ দেখে অ্যাডেনোমায়োসিস নিশ্চিত করা যায় না।
জরায়ুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার জন্য বিভিন্ন চিকিৎসার পদ্ধতি নেওয়া হয় , তার মধ্যে কিছু প্রধান পরীক্ষা গুলো হলো:
জরায়ু, ডিম্বাশয় এবং আশপাশের অংশ দেখতে এটি সাধারণ পরীক্ষা। এতে জরায়ুতে ফাইব্রয়েড, সিস্ট বা অন্য কোনও অস্বাভাবিকতা আছে কি না দেখা যায়।
গর্ভধারণে সমস্যা হলে এই পরীক্ষা করা হয়। এতে জরায়ুর ভেতরের গঠন এবং ডিম্বনালির পথ খোলা আছে কি না, তা দেখা যায়। তবে শুধু জরায়ু দেখার জন্য সবার এই পরীক্ষা দরকার হয় না।
জরায়ুর ভেতরে দেখার জন্য এই হিস্টেরোস্কোপি পরীক্ষা করা হয়। একটি সরু যন্ত্রের সঙ্গে ছোট ক্যামেরা থাকে, সেটি জরায়ুমুখ দিয়ে জরায়ুর ভিতরে নিয়ে দেখা হয়। পলিপ, কিছু ধরনের ফাইব্রয়েড বা জরায়ুর ভেতরের অন্য সমস্যা খুঁজে বের করতে এটি ব্যবহার করা হয়।
জরায়ুর জন্য আলাদা করে কোনও “বিশেষ” উপায় আছে, যা করলেই জরায়ু সুস্থ থাকবে, এমন নয়। জরায়ুর স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য মূলত নিজের শরীর ও প্রজনন স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া দরকার। কিছু সাধারণ অভ্যাস এক্ষেত্রে কাজে আসতে পারে:
জরায়ু নিয়ে অনেকেরই কিছু ভুল ধারণা থাকে, বিশেষ করে যখন বিষয়টি গর্ভধারণের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। যেমন:
না। ফাইব্রয়েড ধরা পড়া আর IVF দরকার হওয়া, দুটো এক কথা নয়। অনেক ফাইব্রয়েড কোনও সমস্যাই করে না এবং সব ক্ষেত্রেই চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় না। তবে কিছু ফাইব্রয়েড, বিশেষ করে যেগুলি জরায়ুর ভিতরের অংশকে প্রভাবিত করে, ফার্টিলিটিতে সমস্যা করতে পারে, তখন চিকিৎসক পুরো বিষয়টা দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করেন।
কিছু জরায়ুর সমস্যা বা নির্দিষ্ট ধরনের ফাইব্রয়েড মিসক্যারেজ-এর ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে প্রেগন্যান্সি হলেই মিসক্যারেজ হবে। ঝুঁকি নির্ভর করে সমস্যার ধরন এবং অন্যান্য বিষয়ের উপর।
পিরিয়ডের সময় কিছুটা ব্যথা বা অস্বস্তি হতে পারে। কিন্তু প্রতি মাসে এমন ব্যথা হওয়া, যার জন্য কাজ বন্ধ রাখতে হয়, স্কুল বা অফিসে যাওয়া কঠিন হয়ে যায় বা স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়, সেটাকে শুধু ‘স্বাভাবিক পিরিয়ডের ব্যথা’ বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।
এমন ব্যথার পেছনে এন্ডোমেট্রিওসিস বা এডেনোমায়োসিস-এর মতো কারণ থাকতে পারে। এন্ডোমেট্রিওসিস-এর ক্ষেত্রে তীব্র পিরিয়ডের ব্যথা, দীর্ঘস্থায়ী তলপেটের ব্যথা এবং গর্ভধারণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এডেনোমায়োসিস-এর ক্ষেত্রেও খুব ব্যথাযুক্ত বা বেশি রক্তপাতের মাসিক হতে পারে।
অনেকে মনে করেন জরায়ু সামনের দিকে বা পিছনের দিকে একটু হেলে থাকলে প্রেগন্যাসিতে সমস্যা হয়। আসলে জরায়ুর অবস্থানে এমন স্বাভাবিক পার্থক্য থাকতে পারে এবং শুধু জরায়ু একটু পিছনের দিকে হেলে আছে বলেই ইনফার্টিলিটি হয় না। তাই পরীক্ষায় “tilted” বা “retroverted uterus” লেখা থাকলে সঙ্গে সঙ্গে দুশ্চিন্তা করার কারণ নেই।
জরায়ু বা মাসিক সংক্রান্ত কোনও পরিবর্তন হলেই ভয় পাওয়ার দরকার নেই। অনেক সমস্যার কারণ সাধারণও হতে পারে। তবে কিছু লক্ষণ বারবার হলে বা দৈনন্দিন জীবনে সমস্যা তৈরি করলে বিষয়টি এড়িয়ে না গিয়ে স্ত্বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা ভালো।
বিশেষ করে যদি—
জরায়ু নিয়ে জানার সময় শুধু গর্ভধারণের কথাই ভাবলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়, কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও জানা দরকার যেগুলো সহজ করে বললে: