এই লেখাটিতে পুরুষদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফার্টিলিটির ওপর কী প্রভাব পড়ে, তা সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বয়স অনুযায়ী শুক্রাণুর বিভিন্ন দিক, যেমন শুক্রাণুর সংখ্যা, চলাচলের ক্ষমতা, গঠন (শেপ) এবং DNA-এর মান, কীভাবে ধীরে ধীরে বদলায়, সেটাই এখানে তুলে ধরা হয়েছে।
এছাড়াও এখানে একটি পুরুষদের ফার্টিলিটি বয়স চার্ট দেওয়া আছে, যেখানে দেখা যাবে বয়স বাড়লে সন্তানধারণে কী ধরনের ঝুঁকি থাকতে পারে। যেমন, মিসক্যারেজের সম্ভাবনা বাড়া বা শিশুর জেনেটিক সমস্যার ঝুঁকি।
এছাড়াও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শও রয়েছে, কী ধরনের জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস বা চিকিৎসার মাধ্যমে বয়স বাড়লেও পুরুষরা কীভাবে নিজের ফার্টিলিটি ভালো রাখতে পারেন।
সাধারণত পুরুষদের ফার্টিলিটি নিয়ে খুব একটা আলোচনা হয় না। এর কারণ হলো, অনেকের ধারণা, পুরুষরা যেকোনো বয়সেই বাবা হতে পারেন, কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে বয়স বাড়লে ফার্টিলিটি দ্রুত কমে যায়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, পুরুষদের ফার্টিলিটিও বয়সের সঙ্গে কমে, শুধু নারীদের তুলনায় একটু ধীরে। এই লেখার উদ্দেশ্য হলো পুরুষদের ফার্টিলিটি নিয়ে থাকা ভুল ধারণাগুলো পরিষ্কার করা এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে শুক্রাণুর স্বাস্থ্যে কী কী পরিবর্তন হয়, তা সহজভাবে বোঝানো।
হ্যাঁ, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরুষদের ফার্টিলিটি ধীরে ধীরে কমে। তবে নারীদের মতো হঠাৎ করে বড় কোনো পরিবর্তন (মেনোপজের মতো) পুরুষদের ক্ষেত্রে হয় না।
পুরুষরা ৭০ বছর বা তারও বেশি বয়স পর্যন্ত শুক্রাণু তৈরি করতে পারেন। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুক্রাণুর গুণগত মান কমতে থাকে, এটাই আসল বিষয়।
সাধারণত পুরুষদের ক্ষেত্রে ৩৫ বছরের পর থেকেই বয়সজনিত পরিবর্তন শুরু হয়। এই পরিবর্তনগুলোর কারণে গর্ভধারণে সমস্যা হতে পারে এবং মিসক্যারেজ বা গর্ভাবস্থার কিছু জটিলতার ঝুঁকিও বাড়ে।
সাধারণত পুরুষদের ফার্টিলিটি সবচেয়ে ভালো থাকে ২০ থেকে ৩০ বছরের শুরুর দিক পর্যন্ত। এই সময় শুক্রাণুর সংখ্যা, গুণমান এবং চলাচলের ক্ষমতা ভালো থাকে।
কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, বিশেষ করে ৩৫ বছরের পর, ধীরে ধীরে শুক্রাণুর মান এবং মোটিলিটি (চলাচলের ক্ষমতা) কমতে শুরু করে।
এটা সত্যি যে অনেক পুরুষই বয়স বেশি হলেও বাবা হতে পারেন। তবে তখন গর্ভধারণে সময় বেশি লাগতে পারে, আর কিছু ফার্টিলিটি-সংক্রান্ত সমস্যার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
নিচে দেওয়া পুরুষদের ফার্টিলিটি বয়স চার্টটি দেখলে আপনি পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারবেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একজন পুরুষের ফার্টিলিটির ওপর কীভাবে প্রভাব পড়ে।
নিচে দেওয়া পুরুষদের ফার্টিলিটি বয়স চার্টটি আপনাকে স্পষ্টভাবে বুঝতে সাহায্য করবে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একজন পুরুষের ফার্টিলিটির ওপর কীভাবে প্রভাব পড়ে।
| বয়সের পরিসর | শুক্রাণু উৎপাদন | মোটিলিটি (চলাচলের ক্ষমতা) | মরফোলজি (শেপ/গঠন) | DNA ক্ষতির ঝুঁকি | ফার্টিলিটির অবস্থা |
|---|---|---|---|---|---|
| ৩০ বছরের নিচে | সর্বোত্তম (সবচেয়ে ভালো) | খুব ভালো | স্বাভাবিক | কম | সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি |
| ৩০–৩৪ বছর | সামান্য কমতে শুরু | একটু কম | বেশিরভাগই স্বাভাবিক | কম–মাঝারি | ফার্টিলিটি এখনো ভালো |
| ৩৫–৩৯ বছর | স্পষ্টভাবে কমে | কমে যায় | কিছু শুক্রাণুর গঠনে সমস্যা | মাঝারি | মাঝারি ফার্টিলিটি |
| ৪০–৪৪ বছর | আরও কমে যায় | অনেকটাই কম | অস্বাভাবিক শুক্রাণুর সংখ্যা বাড়ে | বেশি | গর্ভধারণে সময় বেশি লাগে |
| ৪৫ বছর ও তার বেশি | অনেকটাই কমে যায় | খুব কম | বেশিরভাগ ক্ষেত্রে খারাপ | খুব বেশি | মিসক্যারেজ ও জেনেটিক সমস্যার ঝুঁকি বেশি |
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরুষদের সামগ্রিক প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব পড়ে। নিচে সহজভাবে বোঝানো হলো:
শুক্রাণুর চলাচলের ক্ষমতা বলতে বোঝায় ডিম্বাণুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি বা গতি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুক্রাণুর এই চলার ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যায়। এর ফলে ডিম্বাণু পর্যন্ত পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে এবং স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণের সম্ভাবনাও কমে যায়।
শুক্রাণুর সংখ্যা বলতে প্রতি বীর্যস্খলনে উৎপন্ন শুক্রাণুর পরিমাণ বোঝায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে যায়। একই সঙ্গে বীর্যের মোট পরিমাণও কমে আসে। এর ফলে ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করার সম্ভাবনা আগের তুলনায় কমে যায়।
শুক্রাণুর সঠিক আকার ও গঠন পুরুষের ফার্টিলিটির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বয়স বাড়লে অনেক সময় শুক্রাণুর আকারে বিকৃতি বা অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। এই ধরনের বিকৃত শুক্রাণু ডিম্বাণুর ভেতরে সহজে প্রবেশ করতে পারে না বা ডিম্বাণুর দিকে ঠিকভাবে এগোতেও পারে না, ফলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমে যায়।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরুষদের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো শুক্রাণুর ডিএনএ-তে ক্ষতি বা ভাঙন (DNA fragmentation) বেড়ে যাওয়া। শুক্রাণুর ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তৈরি হওয়া ভ্রূণের মান ভালো হয় না। এর ফলে গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে এবং শিশুর জেনেটিক সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়।
যদিও পুরুষরা বয়স বাড়লেও শুক্রাণু উৎপাদন করতে পারেন, তবে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে শুক্রাণুর মান কমে যায়। এর প্রভাব শুধু গর্ভধারণের সম্ভাবনার ওপর নয়, ভবিষ্যৎ শিশুর স্বাস্থ্যের ওপরও পড়ে।
বয়স বেশি হলে বিভিন্ন ধরনের গর্ভাবস্থার জটিলতা দেখা দিতে পারে। নির্দিষ্ট বয়সের পর বীর্য ও শুক্রাণু আগের মতো সুস্থ না থাকায় স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণ হতে সাধারণের তুলনায় বেশি সময় লাগে। এছাড়া বয়স বাড়ার সঙ্গে শুক্রাণুর ডিএনএ-তে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়, যার ফলে গর্ভধারণ ব্যর্থ হতে পারে বা গর্ভপাতের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
অবশ্যই, বয়স বেশি হলেও পুরুষরা বায়োলজিক্যাল ভাবে বাবা হতে পারেন। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুক্রাণুর মান কমে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণ করতে কিছুটা অসুবিধা হতে পারে। এই ক্ষেত্রে অনেক সময় দম্পতিকে IVF বা ICSI-র মতো সহায়ক প্রজনন পদ্ধতির সাহায্য নিতে হয়, যাতে সফলভাবে গর্ভধারণ সম্ভব হয়।
এছাড়াও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ও চিকিৎসা নিলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা আরও বাড়ানো যায়।
লগতে পঢ়ক : পুরুষের প্রজনন সমস্যা: লক্ষণ, কারণ এবং কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
বয়স বাড়ার প্রক্রিয়া পুরোপুরি থামানো সম্ভব না হলেও, শুক্রাণুর স্বাস্থ্যের ওপর বয়সের প্রভাব অনেকটাই কমানো যায়। নিচে পুরুষদের ফার্টিলিটি ভালো রাখার কিছু কার্যকর ও বাস্তব টিপস দেওয়া হলো:
সুষম ও স্বাস্থ্যকর খাবার এবং নিয়ন্ত্রিত ওজন প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। ভিটামিন C, ভিটামিন E ও জিঙ্কের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শুক্রাণুকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
ধূমপান ও অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ শুক্রাণুর স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি করে এবং ডিএনএ ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ায়। দীর্ঘ সময় সাউনা বা হট টাবে থাকার ফলে অতিরিক্ত তাপ শুক্রাশয়ের স্বাভাবিক কার্যকারিতায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
যাঁরা নিয়মিত ব্যায়াম করেন, তাঁদের টেস্টোস্টেরন লেভেল ও শুক্রাণুর মান সাধারণত ভালো থাকে। পাশাপাশি ব্যায়াম মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে, যা হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যাঁরা ৩০–৩৫ বছরের মধ্যে আছেন কিন্তু এখনই পরিবার শুরু করতে চান না, তাঁদের জন্য স্পার্ম ফ্রিজিং একটি ভালো বিকল্প হতে পারে। এতে ভবিষ্যতে সুস্থ গর্ভধারণের জন্য ভালো মানের শুক্রাণু সংরক্ষণ করা যায়।
পুরুষদের প্রজনন স্বাস্থ্য প্রায়ই উপেক্ষিত হয়, তবে অন্য শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার মতো এটি ও বয়সের সঙ্গে ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়। যদিও এই ক্ষয় ধীরগতিতে হয়, তা গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমাতে এবং গর্ভাবস্থায় জটিলতা ঘটাতে পারে। তাই বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে শুক্রাণুর স্বাস্থ্যের পরিবর্তন বোঝা এবং তা ভালো রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।